মোমসমুদ্রের রূপকথা । এহসান হায়দার
প্রকাশিত হয়েছে : ১৫ নভেম্বর ২০১৫, ৪:২৩ অপরাহ্ণ, | ৩৬৬৭ বার পঠিত
এ লেখা কবির সাথে কবিতার— কবিতার সাথে পাঠকের যে সম্পর্ক ও সংশ্লেষণ তৈরি করেছে তার অতরঙ্গ অনুভবের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছে। আমাদের অভ্যস্ত কবি ও কবিতার আলোচনার ছুরি কাঁচি তত্ত্ব তালাশের কাছ থেকে সচেতনভাবেই এই লেখাকে দূরে রাখা হয়েছে।
এ লেখা কবির সাথে কবিতার— কবিতার সাথে পাঠকের যে সম্পর্ক ও সংশ্লেষণ তৈরি করেছে তার অতরঙ্গ অনুভবের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছে। আমাদের অভ্যস্ত কবি ও কবিতার আলোচনার ছুরি কাঁচি তত্ত্ব তালাশের কাছ থেকে সচেতনভাবেই এই লেখাকে দূরে রাখা হয়েছে।
.
‘ …শেষ রাতে গোপন হোমের/ যজ্ঞ কেউ শুরু করে দেবে।.
.
রাতের কঙ্কাল ভাসে ‘দেয়ালঘেরা’পুকুরের জোনাকি আলোয়। অনন্ত রহস্য ঋতুর হয় না শেষ। শীতের কুয়াশা কঠিন শরীরে ঝুলে থাকে বসন্তের ছবি। বৃষ্টি বলে যাকে পৃথিবীতে ঝরে যেতে দেখেছে সকলেই তার স্মৃতির ভেতর ঘুমিয়ে পড়েছে মৃত্যু; আর জাগে না! মোমের জন্মকথা নিয়ে পুরাণ, শ্লোক আর স্তব গান গাওয়া শেষ হয়ে গেলে মুক্তিদাতার ভয়ে কেঁপে উঠি; বলে উঠি ‘কী করব আমি ? কী করতে পারি ? আমি যে এখনো ক্ষুদ্র !’ ‘মোমসমুদ্রের’ গোপন সব নথি গলে চাঁদের পেট থেকে বেরিয়ে আসে ধূলিঝড়, মানসিংহের ঘোড়ায় চড়ে সময় ছুটে চলে যায় বহু সময়ের অস্ফুট সর্বনাশের কাঁটাতার পেরিয়ে ‘মোহতন্দ্রা ভেঙ্গে ধ্যানগরিমার জাল ছিঁড়ে।’এখান থেকেই যেনো কবি যজ্ঞের শুরু— জীবন ডানা মেলে গিরিচূড়ার গুহাপথ পেরিয়ে পূর্বতন আতঙ্কের রক্তমাখা হাড়ের শিকড় অভিমুখী প্রশ্নস্রোতধারায় নিজস্ব ভাষা ও বর্ণনা বরাবর সাজ্জাদ শরিফের কবিতা অভিযানের।
.
কবি প্রকৃত কী আকাঙ্ক্ষা করে? স্বাধীনতা। কী এই স্বাধীনতা? যাকে আলিঙ্গন করে নিতে পারলেই বোধের ধারালো তন্তুগুলো আরো মর্মস্পর্শী ও স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে ওঠে। কেনই বা কবির জন্য এই স্বাধীনতা যাপন অনিবার্য? সত্য ও রহস্যের ওপারে পৌঁছাতে হলে নিজেকে ঝরঝরে ডানার মতন হালকা ও অবমুক্ত করে নিতে হয় সকল কাঠামো ও শৃঙ্খলের মায়াময় সংস্পর্শ থেকে। তবেই মুক্তির প্রকৃত স্বাদ জাগে। সত্যের নিষ্ঠুর উপলব্ধির উন্মাদনার জন্ম হয়। সমাজ ও ব্যবস্থাপনা খনোই নিজের উপর হামলাকে বরদাস্ত করে না। আর কবিতার শুরু হয় এই সত্য বক্তব্যের সংবেদনশীল দ্বান্দ্বিকতায়। কবি তা অন্তরঙ্গ অনুভবের নির্যাস দিয়েই তাঁর বাক্যকে নির্মাণ করেন। আত্ম সত্যের উদ্বোধনের শৈলী দিয়েই কবিতার শরীরকে রূপময় আলোর গাণ্ডীব হিসেবে মানবিক তীর ছুঁড়েন। যাপন ও অভিজ্ঞতার প্রতি মুহূর্তের সংঘাত ও সংশ্লেষণের মধ্য দিয়ে যে জীবন এগিয়ে যায় তার নির্মোহ পর্যবেক্ষণই তো কবি তাঁর প্রকাশ মাধ্যমের মধ্য দিয়ে প্রকৃতি ও পরিবেশের সাথে আন্তঃসম্পর্কের পারস্পারিক চিত্রকল্পের অভিজ্ঞানে সামনে হাজির করেন— নিজস্ব উপলব্দিজাত স্বতন্ত্র শব্দ বাক্যের নিখুঁত গাঁথুনিতে। এই নিজস্ব সুর ও স্বর এক আকাক্সিক্ষত মুহূর্ত কবির কাছে। সমাজ রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিবেশ পরিবেশের সাথে কবির যে দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক তার ক্রমাগত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এসে কবি পৌঁছান অভীষ্ট লক্ষ্যের সেই স্বতন্ত্রতায়। কবি যদিও ব্যক্তিক অনুভূতির বর্ণনাই করে চলেন কিন্তু এই ব্যক্তি অনুভূতি কোনো একক ব্যক্তিক অনুভূতি আর থাকেন না সম্পূর্ণভাবে সামষ্টিক হয়ে উঠেন আর এখানেই কবির নিজস্ব স্বরের উদ্বোধন। এখান থেকে পূর্ববর্তী সকল অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার নতুন রূপান্তরের শুরু। এই রূপবদল মানসিক আর্তির গহ্বরে লুকিয়ে থাকা নিষ্ঠুর সত্যের সংবেদন। সাজ্জাদ শরিফ তাঁর কবিতা যাপনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সে নির্মম রুষ্ট সমাজ ও ব্যক্তিচেতনার সামনে এনে দাঁড় করান আমাদের যার গহীন অন্তরালেই কবিতার জন্ম। যেখানে অতীন্দ্রিয় যুক্তি কাঠামোর পুরাণের সাথে বাস্তবতার ছায়া ঘুরে ফিরে সত্যমত এক আলোর তীব্র ক্ষার সৃষ্টি করে অথচ অভিজ্ঞতার জগৎ যার স্পষ্ট স্বরূপ উপস্থিত দেখতে পায় না যেনো কোনো ইশারা যেনো কোনো রহস্যের ঠিক সমাধান মুহূর্তে উৎকণ্ঠায় নিবিষ্ট পায়চারি। এভাবেই সাজ্জাদ শরিফের ‘ডানা’এগিয়ে যায় শব্দের নতুন গড়ন বাক্যের নতুন সম্পূর্ণ অনভ্যস্ত এক উপস্থাপনের অভিজ্ঞতায়। এই নব রূপ‘শিরায় শিরায় গাড় ছায়া এঁকে যায়’। দিশার রহস্য ভেদ করে আরো অনন্ত রহস্যের সত্য বরাবর।.
.
.
শেষ কোথায় ? শেষের শেষে যে শুরু তার শেষে কিংবা আলোর গতি বরাবর আলোহীন কোনো অবস্থান কী শেষ? মূলত শেষ এক প্রকার শুরুর জিজ্ঞাসা। ভাবনার বহুস্বর ও বৈচিত্র্যময় উপস্থিতির বাস্তবতায় ক্রমাগত সংশ্লেষণী একটি প্রক্রিয়া। শুরু বলে যাকে আমরা চিহিৃত করছি সেও এক আপাত মীমাংসিত অবস্থান পরবর্তী প্রশেড়বর সূচনা মাত্র।পূর্ববর্তী কবিতা স্রোতের বাইরে এসে শুধু ব্যক্তি বা সামষ্টিক অনুভবের বা উদ্দেশ্যের পরিকল্পিত স্বরে মধ্য আশির কবিতা শুধুমাত্র এগিয়ে যায়নি। রূপান্তরের অনিবার্য সন্ধিক্ষণে এসে তখনকার কবিতা বিষয়ের বৈচিত্রতার সাথে অনুভবের নানামাত্রিক পরাগায়ন ও সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর ভাবনা কাঠামোকে বা নানা রকম ডিসকোর্সের মধ্য দিয়ে তারা নির্মাণ করেন এক নতুন অভিজ্ঞতার যার সাথে প্রকৃতই বাংলা কবিতার পূর্ব পরিচয় ছিল না। কবিতার মননের ‘মাস্তুলে আঘাত লেগে সূর্য ঝরে গিয়েছে পশ্চিমে’ সেই সূর্যকে নব প্রভাতের আলোর সাথে সম্পর্কিত করার যে শব্দযুদ্ধ শুরু হয়েছিলো সে যুদ্ধের একজন সফল যোদ্ধা হিসেবে কবি সাজ্জাদ শরিফের নাম কবিতার ইতিহাসে তাঁর ভাষা ও বিষয় বৈচিত্রতার বহুমাত্রিক সুচিন্তিত পদচিহৃ সুনিশ্চিত ভাবেই থেকে যাবে তা অনায়াসেই বলে রাখা যায়।
.
এখানে এই পৃথিবীতে জীবনের করোটিতে অভিজ্ঞতার গহীন রাত এসে ঘুমিয়ে পড়েছে। জেগে ওঠার অলিঙ্গন খেয়ে ফেলেছে ভোগের নিষ্ঠুর তোষণ। নদী আর অরণ্যের দিকে যে পথগুলো খোলা ছিল নক্ষত্র আর সূর্যনীল স্বপেড়বর কুয়াশায় ভেজা টলমল সে রোদের অস্তিত্বে ঢুকে পড়েছে সর্বগ্রাসী অন্ধকারের ‘কালিমা’। তনারাজ্যের যন্ত্রণাপথে বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে বিপদজ্জনক সেই সব ভীতির উপাখ্যান যা শিখে নিয়ে হাজার বছর ধরে যে প্রাণ যে প্রেম যে সরলতার জীবনস্রোত বহমান ছিল সাবলীল তার গতি পথের ঈর্ষাযোগ্য উর্বর ভূমির জল হাওয়া মাটিকে রক্তাক্ত করা হয়েছে বৃত্তির উচ্চকিত পরিবেশনা ও বিপণনের স্বাভাবিক প্রাবল্যে। প্রসারিত দুই হাত ভরে যে পারস্পারিক আক্রমণের জীবন বেছে নিলাম আমরা কোনো ঘোষণা ছাড়াই গভীরতম অসুখের ‘অতিকায় দানো’ এসে সব পথ সব জ্ঞান সব প্রজ্ঞার গায়ে চুনকালি মাখিয়ে ফেলে রেখে গেল অগিড়বপরিখার পেটে’এখন কোন বীজ থেকে উদগত হবে সেই ‘দ্বীপাবালিকার’উচ্ছল দিন আর অন্ধকার খুঁড়ে বের করে আনা আলো রূপকথার। জানা নেই; তবুও কিছু আশার আকাক্সক্ষা বাঁচিয়ে রাখে সচল বীজ ভাসিয়ে দেয়‘তরঙ্গশীর্ষের জলে’ কোথাও যদি শুধু প্রাণের প্রাচুর্য জেগে উঠে, রুদ্ধ বোধের রোধন কেটে যায় আর শুরু হয়ে যায় এক আলো মর্মর মানুষ জীবন। শুধু ঠিক তখনই মনুষের ইতিহাস আবারো মানুষের নিঃকন্টক মানবিক বোধের দখলে চলে আসবে। যদিও আমরা ‘যে দ্বীপে বসত করি তার নাম ক্ষণপরিত্রাণ’। যেন আটকে গেছি কোনো এক পেন্ডুলামের অতল ‘শ্বাসরুদ্ধ মাতাল সাগরে’, চারদিকে শুধু অথৈ ঢেউয়ের আগ্রাসন। পরিত্রাণ কোথায়? কোন সে মন্ত্র? কোথায় সে কণ্ঠ ? স্বরে ও উচ্চারণে যে জাগিয়ে তুলবে ‘ গোধূলিসাঁতার’। তার কোন সন্ধানই আমাদের অন্তর্গত এখনো — যে টিমটিমে আলো বেঁচে আছে দিতে ব্যর্থ। এই ব্যর্থতার বিপুল সম্ভাবনায় ছেয়ে গেছে ‘মোমসমুদ্রের’ জল। আজ আর শুধু সংঘর্ষেই ‘রক্তপাত ঠেকাতে পারবে না’ কেউ।.






